Chorabali Logo

মামস এর লক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসা |

মামস, যাকে বাংলায় আমরা ‘গলা বসন্ত’ বা ‘গাল বসন্ত’ বলি, একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ যা প্যারোটিড গ্রন্থিগুলিকে প্রভাবিত করে। বিভিন্ন ভাবে মামস এর লক্ষণ বোঝা যায়। প্যারোটিড গ্রন্থি হল লালা গ্রন্থি, যা কানের নিচে এবং চোয়ালের দুই পাশে অবস্থিত। মামস সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে এটি বয়স্কদেরও আক্রান্ত করতে পারে।

মামস এর লক্ষণ

মামস এর লক্ষণগুলো সাধারণত সংক্রমণের ১৬-১৮ দিন পরে দেখা যায়। প্রধান লক্ষণগুলো হল:

  1. গালের ফোলাভাব ও ব্যথা: প্যারোটিড গ্রন্থি ফুলে যায় এবং এর ফলে গালে ব্যথা হতে পারে।
  2. জ্বর: সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি ধরনের জ্বর হতে পারে।
  3. মাথাব্যথা: মাথায় ব্যথা অনুভব হতে পারে।
  4. গলা ব্যথা: গলা বসন্তের কারণে গলায় ব্যথা এবং শুষ্কতা হতে পারে।
  5. ক্ষুধামন্দা ও ক্লান্তি: ক্ষুধা কমে যেতে পারে এবং ক্লান্তি অনুভব হতে পারে।
  6. শরীরে ব্যথা: শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভব হতে পারে।

মামস এর চিকিৎসা

মামস এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তবে মামস এর লক্ষণ গুলো উপশম করার জন্য কিছু পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে:

  1. বিশ্রাম: পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে, যা শরীরকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে।
  2. পানি পান: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়।
  3. পেইন রিলিফ: জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা যেতে পারে।
  4. ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস: ফোলা স্থানগুলিতে ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  5. মুচি খাবার: গলার ব্যথা কমানোর জন্য নরম খাবার খেতে হবে।
  6. আলাদা থাকা: মামস ছোঁয়াচে, তাই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যান্যদের দূরে রাখতে হবে, বিশেষ করে যারা মামসের টিকা নেয়নি।

প্রতিরোধ

মামস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল টিকা গ্রহণ। MMR (Measles, Mumps, Rubella) টিকা সাধারণত শিশুদের ১২-১৫ মাস বয়সে এবং ৪-৬ বছর বয়সে দেওয়া হয়। এই টিকা মামস, হাম ও রুবেলা থেকে রক্ষা করতে পারে।

মাম্পস কতদিন থাকে

মাম্পসের সংক্রমণ সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। সংক্রমণটি কয়েকটি ধাপে বিকশিত হয়:

  1. ইনকিউবেশন পিরিয়ড: মাম্পস ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পর মামস এর লক্ষণ গুলি দেখা দিতে প্রায় ১৬-১৮ দিন সময় লাগে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ১২-২৫ দিনের মধ্যে হতে পারে।
  2. প্রাথমিক লক্ষণ: প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা এবং পেশী ব্যথা থাকতে পারে। এই লক্ষণগুলি সাধারণত ১-২ দিন স্থায়ী হয়।
  3. ফোলাভাব: মাম্পসের সবচেয়ে স্বতন্ত্র লক্ষণ হল প্যারোটিড গ্রন্থির ফোলাভাব, যা প্রায় ৭-১০ দিন স্থায়ী হয়। ফোলাভাবের কারণে মুখ ও গালের একপাশ বা দুইপাশ ফুলে যায় এবং ব্যথা হতে পারে।
  4. সেরে ওঠার সময়: সাধারণত ৭-১০ দিন পর ফোলাভাব এবং অন্যান্য উপসর্গ কমতে শুরু করে এবং সংক্রমিত ব্যক্তি ধীরে ধীরে সেরে ওঠে। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

সংক্রমণ ক্ষমতা

মাম্পস ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়ার ১-২ দিন আগে এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৫ দিন পর পর্যন্ত সংক্রমিত ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। তাই এই সময়কালে রোগীকে বিশ্রামে রাখা এবং অন্যদের থেকে আলাদা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

পরামর্শ

মাম্পসের লক্ষণ দেখা দিলে যথাসম্ভব বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পেইন রিলিফ ওষুধ গ্রহণ করা উচিত। গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মাম্পস এর ঘরোয়া চিকিৎসা

মাম্পসের ঘরোয়া চিকিৎসা মূলত লক্ষণ উপশম এবং অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সহায়ক। নিম্নলিখিত কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে মামস এর লক্ষণ গুলো কমানো যায়:

মাম্পসের ঘরোয়া চিকিৎসা

  1. বিশ্রাম: যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্রাম শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং দ্রুত সুস্থ হতে সহায়ক।
  2. পানি ও তরল গ্রহণ: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল পান করা উচিত। এটি ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  3. পেইন রিলিফ: ব্যথা ও জ্বর উপশম করতে প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে, এসপিরিন শিশুদের জন্য সুপারিশ করা হয় না।
  4. ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস: ফোলা এবং ব্যথাযুক্ত স্থানে ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস প্রয়োগ করা যেতে পারে। এটি ফোলাভাব এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
  5. নরম ও সহজপাচ্য খাবার: নরম ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত যেমন স্যুপ, দই, খিচুড়ি ইত্যাদি। কঠিন ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো চিবানো কঠিন হতে পারে।
  6. লবণ পানি দিয়ে গার্গল: গলা ব্যথা ও ফোলা কমানোর জন্য গরম লবণ পানির গার্গল করা যেতে পারে।
  7. ভিটামিন সি: ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন কমলা, লেবু, আমলকি ইত্যাদি খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

সতর্কতা

  • অন্যদের থেকে আলাদা রাখা: মাম্পস ছোঁয়াচে, তাই সংক্রমিত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা উচিত, বিশেষ করে যারা মাম্পসের টিকা নেয়নি।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি লক্ষণগুলো গুরুতর হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মাম্পস সাধারণত স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়, তবে সঠিক যত্ন ও বিশ্রাম নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপরোক্ত ঘরোয়া চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

বড়দের মামস হলে করণীয়

বড়দের মামস হলে একই ধরনের যত্ন প্রয়োজন, তবে বয়সের কারণে কিছু বাড়তি সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনা দরকার হতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রে মামসের লক্ষণ এবং জটিলতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে, তাই সঠিকভাবে যত্ন নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কিছু করণীয় দেওয়া হলো:

বড়দের মামস হলে করণীয়

সাধারণ যত্ন

  1. বিশ্রাম: পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। শরীরকে বিশ্রামে রাখলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে।
  2. পানি ও তরল পান: ডিহাইড্রেশন এড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি এবং অন্যান্য তরল পান করুন।
  3. পেইন রিলিফ: ব্যথা এবং জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল বা ইবুপ্রোফেন গ্রহণ করুন। তবে, ওষুধ গ্রহণের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  4. ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস: ফোলা এবং ব্যথাযুক্ত স্থানে ঠান্ডা বা গরম কম্প্রেস প্রয়োগ করুন।
  5. নরম ও সহজপাচ্য খাবার: নরম ও সহজপাচ্য খাবার যেমন স্যুপ, দই, খিচুড়ি ইত্যাদি খান। কঠিন এবং চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
  6. লবণ পানি দিয়ে গার্গল: গলা ব্যথা এবং ফোলা কমাতে গরম লবণ পানির গার্গল করুন।

বিশেষ যত্ন

  1. অতিরিক্ত সতর্কতা: বড়দের ক্ষেত্রে মামসের জটিলতা যেমন অন্ডকোষের প্রদাহ (ওরকাইটিস), ডিম্বাশয়ের প্রদাহ (ওফোরাইটিস), মেনিনজাইটিস বা প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  2. চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি উচ্চ মাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, পেটে তীব্র ব্যথা বা অন্ডকোষে ব্যথা ও ফোলা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  3. অন্যদের থেকে আলাদা রাখা: সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন, বিশেষ করে যারা মামসের টিকা নেয়নি।
  4. ভিটামিন ও পুষ্টি: ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

প্রতিরোধ

  1. টিকা গ্রহণ: বড়দের ক্ষেত্রে, যদি পূর্বে মামসের টিকা (MMR টিকা) না নিয়ে থাকে, তবে টিকা গ্রহণ করা উচিত। এটি মামস, হাম ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়।

মাম্পসের ক্ষেত্রে বড়দের জন্য সঠিক যত্ন ও দ্রুত চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপরের পরামর্শগুলো মেনে চললে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব। মামস একটি গুরুতর রোগ না হলেও, এর উপসর্গ ও জটিলতা অনেক বিরক্তিকর হতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে শরীর দ্রুত সুস্থ হতে পারে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও টিকা গ্রহণ করে মামস থেকে নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করা সম্ভব।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top